Skip to content
Home » Blog » বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় ‘রইদ’ নিয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন

বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় ‘রইদ’ নিয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন

ভোরে ‘রইদ’ টিম যখন রাজশাহীতে নামে, তখন মুষলধারে বৃষ্টি। বিকেলে এই বৃষ্টির হুমকি মাথায় নিয়েই খোলা আকাশের নিচে শুরু হয় আলোচনা। মাঝপথে আবারও নামে বৃষ্টি। বৃষ্টিভেজা বিকেল গড়িয়ে রাত। তবু থেমে থাকেনি আড্ডা, বিশ্লেষণ আর প্রশ্নোত্তর। গত শনিবার ‘রইদ: প্রতীক, পুনরাবৃত্তি, প্রেম ও পৌরাণিক আলো-আঁধারি ভাষার সামষ্টিক অধ্যয়ন’ শিরোনামের এ ব্যতিক্রমী আয়োজনটি করেছিল ম্যাজিক লণ্ঠন স্কুল।

বিকেলে রাজশাহী নগরের চৌদ্দপাইয়ে ম্যাজিক লণ্ঠন স্কুল প্রাঙ্গণে আলোচনায় অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মানস চৌধুরী, নির্মাতা নূরুল আলম আতিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যমের অধ্যাপক আ-আল মামুন, নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুস সালাম জীবন, কথাসাহিত্যিক মামুন হুসাইনসহ বিভিন্ন অঙ্গনের শিক্ষক, চলচ্চিত্রকর্মী ও দর্শক। উপস্থিত ছিলেন ‘রইদ’–এর নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন, সিনেমাটোগ্রাফার জোহায়ের মুসাভ্বির জ্যোতি,

অভিনয়শিল্পী নাজিফা তুষি, আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদসহ চলচ্চিত্রটির কলাকুশলীরা। আলোচনা শুনতে আসেন রাজশাহীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সিনেমাপ্রেমীরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ম্যাজিক লণ্ঠন স্কুলের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এস এম অনিক ইসলাম।

স্বাগত বক্তব্যে অনিক ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে ‘রইদ’ নিয়ে নানা আলোচনা হলেও চলচ্চিত্রটিকে বিভিন্ন শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সমন্বিতভাবে পাঠের উদ্যোগ আগে দেখা যায়নি। সেই ভাবনা থেকেই নির্মাতা, গবেষক, শিক্ষক, শিল্পী ও দর্শককে এক মঞ্চে এনে চলচ্চিত্রটির ভাষা, প্রতীক, নির্মাণশৈলী ও দার্শনিক দিক নিয়ে আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে।

‘রইদ: প্রতীক, পুনরাবৃত্তি, প্রেম ও পৌরাণিক আলো-আঁধারি ভাষার সামষ্টিক অধ্যয়ন’ শিরোনামের এ ব্যতিক্রমী আয়োজনটি করেছিল ম্যাজিক লণ্ঠন স্কুল। প্রথম আলো

আলোচনায় অধ্যাপক মানস চৌধুরী বলেন, কোনো চলচ্চিত্রকে শুরুতেই ‘আর্ট’ বা ‘বাণিজ্যিক’—এ ধরনের শ্রেণিবিভাগে ফেলে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। রইদ দর্শকের রুচিকে অনুসরণ করেনি, বরং নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের প্রচলিত গল্প বলার ধারা থেকে ভিন্ন এক ভিজ্যুয়াল ভাষা নির্মাণ করেছে, যা ধৈর্য নিয়ে পাঠ করার দাবি রাখে।

নির্মাতা নূরুল আলম আতিক বলেন, সিনেমা শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক শিল্পমাধ্যম হলেও প্রতিটি দেশের নিজস্ব চলচ্চিত্র ভাষা তৈরি হওয়া জরুরি। ‘হাওয়া’ দিয়ে যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, ‘রইদ’ সেটিকে আরও সুস্পষ্ট করেছে। শিল্প ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে যে অদৃশ্য বিভাজন ছিল, এই ধরনের চলচ্চিত্র সেই দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, রইদ মূলত মানুষের অস্তিত্ব, প্রকৃতি, পৌরাণিক প্রতীক ও জীবনপ্রবাহের সম্পর্ক নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র। ছবিটির প্রতিটি দৃশ্য, চরিত্র, লোকজ উপাদান ও ভিজ্যুয়াল নির্মাণের পেছনে অর্থ রয়েছে, যা গভীর পাঠের দাবি রাখে। লালন, এস এম সুলতানের শিল্পভাবনা, প্রকৃতি ও পৌরাণিক ইঙ্গিতের আলোকে চলচ্চিত্রটি বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

আলোচনার একপর্যায়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে নির্মাতাকে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, তিনি নিজের চলচ্চিত্রের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে চান না। কারণ, একটি শিল্পকর্ম দর্শকের মনে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ তৈরি করে। তাঁর ভাষায়, ‘আমি যা ভেবেছি, দর্শক তার বাইরে গিয়ে আরও অনেক কিছু ভাবতে পারেন। সেটাই শিল্পের আনন্দ।’ তিনি আরও বলেন, ‘মায়ের মুখে শোনা একটি লোককাহিনি থেকে রইদ–এর গল্প এসেছে। তবে সেই সরল গল্পকে চলচ্চিত্রের ভাষায় রূপ দিতে গিয়ে তিনি এই ভূখণ্ডের লোকবিশ্বাস, পুরাণ, দর্শন ও অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। একটি দেশের চলচ্চিত্রকে শুধু লোকেশন বা পোশাক দিয়ে নয়, সেই সমাজের চিন্তা, সংস্কৃতি ও দর্শনের মধ্য দিয়েই নিজস্ব ভাষা খুঁজে নিতে হয়। তবে মেজবাউর বলেন, এই গল্পের সরলতা মা, জটিলতা আমি।’

‘রইদ: প্রতীক, পুনরাবৃত্তি, প্রেম ও পৌরাণিক আলো-আঁধারি ভাষার সামষ্টিক অধ্যয়ন’ শিরোনামের এ ব্যতিক্রমী আয়োজনটি করেছিল ম্যাজিক লণ্ঠন স্কুল। প্রথম আলো

আলোচনা শেষে দর্শকেরাও চলচ্চিত্রটির প্রতীক, পুনরাবৃত্তি, প্রকৃতি, পৌরাণিক ইঙ্গিত ও নির্মাণভাষা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। দর্শকদের কেউ কেউ ছবির নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্যের আলোকসজ্জা, মেলার পরিবেশ এবং বিভিন্ন প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে মেজবাউর রহমান বলেন, ছবির অনেক দৃশ্যই সচেতনভাবে বাস্তবতার বদলে স্বপ্নময় আবহে নির্মাণ করা হয়েছে। দর্শকের অনুভূতি ও চরিত্রের মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চিত্রগ্রাহক জোহায়ের বলেন, চলচ্চিত্রে ক্যামেরা শুধু দৃশ্য ধারণের যন্ত্র নয়, এটি গল্প বলারও একটি ভাষা। অনেক সময় পরিকল্পনার পাশাপাশি শুটিংয়ের মুহূর্তে তৈরি হওয়া অনুভূতিও দৃশ্য নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আলোচনায় পরিচালক জানান, ‘রইদ’ নির্মাণে কয়েক বছর সময় লেগেছে। শুটিংয়ের আগে দীর্ঘ সময় ধরে লোকেশন, বাড়িঘর, গাছপালা ও পরিবেশ তৈরি করা হয়। শিল্পীদেরও সেই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যাতে অভিনয় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

কীভাবে চিত্রনাট্য লেখেন, জানতে চান এক অংশগ্রহণকারী। মেজবাউর রহমান বলেন, একটি গল্প নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ভাবেন। প্রথমে বিভিন্ন সংলাপ আলাদা করে লিখে রাখেন। পরে ধীরে ধীরে গল্পের কাঠামো তৈরি করেন।
অনুষ্ঠানের মধ্যেই ‘রইদ’ ছবির একটি গান পরিবেশন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী হালিমাতুস সাদিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *