Skip to content
Home » Blog » ‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি’

‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি’

পানির ওপর দাঁড়িয়ে ছেঁড়া শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে ধরে ছিলেন আশা খাতুন। আঙুল তুলে দেখালেন, যেখানে একসময় তাঁর ঘর ছিল, এখন সেখানে শুধু ঘোলা পানি। মাটির ঘরটা আর নেই। ভেসে গেছে ধানের গোলা, চাল, হাঁস-মুরগি। পুকুরের মাছও বন্যার পানিতে বেরিয়ে গেছে।

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ষাটোর্ধ্ব এই নারী। তিনি বলছিলেন, ‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি। আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, ক্যানে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’ (ও বাবা, আমার ঘর আর নেই, কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। কোথায় যাব, কোথায় থাকব, মাথা গোঁজার জায়গাই–বা কোথায় পাব, জানি না।)

আশা খাতুনের স্বামী আবদুর রাজ্জাক কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে কোনোরকমে চলছিল সংসার। দুই ছেলে দিনমজুরের কাজ করেন। সারা জীবনের সঞ্চয়ে তৈরি করা মাটির ঘরটিই ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্বল। সেই ঘরও এখন নেই।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা আশা খাতুন। চার দিন আগে গভীর রাতে বন্যার পানি হুড়মুড় করে তাঁর ঘরে ঢুকে পড়ে। মুহূর্তেই তলিয়ে যায় মাথা গোঁজার একমাত্র সম্বলটি। এক কাপড়েই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। যাওয়ার সময় সঙ্গে নিতে পারেননি কোনো কাপড়, চাল কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এখন গ্রামের এক প্রতিবেশীর পাকা দালানে আশ্রয় নিয়েছেন।

গতকাল রোববার দুপুরে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে নিজের ভিটায় এসেছিলেন তিনি। হয়তো দেখতে, কিছু অবশিষ্ট আছে কি না। কিন্তু পানির কারণে কিছুই খুঁজে পাননি।

আশা খাতুনের স্বামী আবদুর রাজ্জাক কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে কোনোরকমে চলছিল সংসার। দুই ছেলে দিনমজুরের কাজ করেন। সারা জীবনের সঞ্চয়ে তৈরি করা মাটির ঘরটিই ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্বল। সেই ঘরও এখন নেই। আশা খাতুন ছেঁড়া শাড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এই এক কঅর (কাপড়) লই বাইর অই। আর কিছু আনিত ন পারি। চিড়া আর পানি খাই আছি।’

পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় সব কাঁচা রাস্তা পানির নিচে। মাঠ, পুকুর, গাছপালা—সব মিলেমিশে একাকার। কোথাও মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে। কোথাও ঘরের টিনের চালা পানির ওপরে দেখা যাচ্ছে। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ নষ্ট হওয়া জিনিসপত্র খুঁজছেন, কেউ কাদা সরাচ্ছেন। অনেকেই এখনো রয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্র বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে।

বন্যার পানিতে প্লাবিত বাঁশখালীর পশ্চিম কোকদন্ডী এলাকা। গতকাল তোলা

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ঢলের পানি এত দ্রুত বাড়ে যে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগই পাননি অনেকে। কেউ গবাদিপশু বাঁচাতে পারেননি, কেউ চাল-ডাল। অনেক পুকুরের মাছও পানির সঙ্গে ভেসে গেছে।

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনপদকে কয়েক দিনের মধ্যে বন্যাকবলিত করে তোলে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হয়েছে ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টি। আগামী দুই থেকে তিন দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

এই বৃষ্টির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বাঁশখালীতে। ৬ জুলাই থেকে উপজেলার বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথারিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। কয়েক দিন আগে পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও গতকালের বৃষ্টিতে আবার কিছু এলাকায় পানি বাড়ছে। আশা খাতুন বলেন, ‘ঝড় থামে, আবার শুরু অয়। আল্লাহ জানে, আর কত দিন এই কষ্ট থাইব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *