Skip to content
Home » Blog » গভীর রাতে আল্লাহর ডাক আপনি কি শুনতে চান

গভীর রাতে আল্লাহর ডাক আপনি কি শুনতে চান

রাত তিনটা। বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে। আপনি শুয়ে আছেন। ঘুম আসছে না। ফোনের স্ক্রিনে চোখ। রিলসের পর রিলস দেখছেন। মন চাচ্ছে না, তবু স্ক্রল করছেন। এক অদ্ভুত শূন্যতা ও বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন আপনার হৃদয়-মন।

অথচ ঠিক সেই মুহূর্তে, রাতের সেই নিস্তব্ধ অন্ধকারে আল্লাহ–তাআলা আসমান থেকে ডাকছেন। ‘কে আছ যে আমাকে ডাকবে? আমি সাড়া দেব। কে আছ যে চাইবে? আমি দেব—যা চাইবে তা-ই।’

সেই ডাক কি আপনি শুনতে পান? সেই ডাক কি আপনি শুনতে চান?

বিজ্ঞানের বক্তব্য

গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের শেষ প্রহরে মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে শান্ত থাকে এবং গভীর মনোযোগের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত অবস্থায় থাকে। এই সময়ে আধ্যাত্মিক অনুশীলন মানসিক চাপ কমায়, কাজে একাগ্রতা বাড়ায় এবং দিনের বাকি সময়টুকু আরও উৎপাদনশীল করে তোলে। (Hölzel, B. K. et al., 2011, Psychiatry Research: Neuroimaging, 191/1, এলসেভিয়ার, আয়ারল্যান্ড)

আধুনিক বিজ্ঞান এখন যা বলছে, রাতের নিরিবিলি সময়টা আত্মার পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য সবচেয়ে উর্বর সময়, পবিত্র কোরআন চৌদ্দ শ বছর আগেই সেই কথা বলে রেখেছে।

কোরআন কী বলেছে

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে চাদর–আবৃত মানুষ, রাতে ইবাদতে দাঁড়াও, তবে অল্প সময় ছাড়া। অর্ধরাত অথবা তার চেয়ে একটু কম অথবা তার চেয়ে একটু বেশি। আর কোরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ১-৪)

এই আয়াতগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে আপনার তিনটি জিনিস চোখে পড়বে।

প্রথমত, হে বস্ত্রাবৃত। মহানবী (সা.) তখন চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলেন। আল্লাহ সেই মুহূর্তে ডাক দিলেন। মানে আল্লাহ জানেন আপনি বিশ্রামে আছেন, তবু তিনি ডাকছেন। এই ডাক ভালোবাসার ডাক, আদেশের নয়।

দ্বিতীয়ত, রাতে দাঁড়াও। আলোচিত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে নবুয়তপ্রাপ্তির শুরুর দিকে। আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে প্রথম দিকেই নির্দেশ দিলেন রাতে ওঠার, নামাজ পড়ার। এভাবে যে জীবনকে বদলাতে চায়, তার শুরুটা হয় রাতে, ইবাদতের মাধ্যমে।

তৃতীয়ত, ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে কোরআন পড়ো। এখানে ‘তারতিল’ বলে একটা শব্দ আছে, যার মানে কোরআন শুধু ধীরে পড়া নয়, প্রতিটি শব্দের অর্থ অনুভব করে পড়া। রাতের নিস্তব্ধতায় অনুভব করা যতটা সহজ, দিনের কোলাহলে ততটা সহজ নয়।

রাতের ইবাদতে কোরআনের শিক্ষা

১. রাতের ইবাদত মনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। আল্লাহ একই সুরায় বলেন, ‘নিশ্চয়ই রাতের ইবাদত মনকে দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করে এবং কোরআনের কথাগুলো হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে দেয়।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ৬)

এই আয়াতে ‘নাশিআত’ বলে যে শব্দ আছে, তার মূলে আছে ‘নাশআ’—যার মানে উৎপত্তি হওয়া, বেড়ে ওঠা। রাতের ইবাদত মানুষের ভেতরে এমন কিছু জন্ম দেয়, যা দিনের ইবাদতে জন্ম নেয় না।

আর “মনকে দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত” করার কথা বোঝাতে এসেছে ‘ওয়াতআ’, যার শাব্দিক অর্থ পা রাখা, ছাপ ফেলা। রাতের ইবাদত মনের ওপর এমন ছাপ ফেলে, যা সারা দিন থাকে। কেননা, তখন মস্তিষ্ক থাকে খালি আর অন্তর থাকে প্রশান্ত।

২. আল্লাহ জান্নাতিদের গুণ বলতে গিয়ে বলেন, ‘আর তারা রাতের শেষ প্রহরে ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ১৮)

এই আয়াতে রাতের শেষ প্রহরের কথা এসেছে, যা ভোরের ঠিক আগের সময়, যখন ফজর আসতে চলেছে। এই সময়ে ঘুম গভীর হয়। আল্লাহ বলছেন, বেহেশতিরা ঠিক এই সময়ে ওঠে।

উঠে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সারা রাত ইবাদত করার পরও তারা ক্ষমা চান। কারণ, তাঁরা জানেন, আল্লাহর অনুগ্রহ পেতে শুধু ইবাদত যথেষ্ট নয়।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকছে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইছে, আমি তাকে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইছে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)

ভাবুন একবার। এই ডাক প্রতি রাতে আসছে। আপনার জন্য। কিন্তু আপনি তখন ঘুমাচ্ছেন। হতে পারে অনেক রাত অবধি ফোন স্ক্রল করে কেবল ঘুমে ডুবছেন, কিংবা কে জানে এখনও চোখ ফোনেই আটকে আছে, যখন আল্লাহ ডাকছেন। এভাবে আপনার সুবর্ণ সময় বেহাত হচ্ছে।

৩. আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ো, এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায় তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত স্থানে আসীন করবেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭৯)

ফরজের পর যা দেওয়া হয় সেটা নফল; কিন্তু তাহাজ্জুদ ফরজ নয়, কিন্তু এটা এমন এক উপহার, যা আল্লাহ বিশেষভাবে তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য রেখেছেন। আর তার প্রতিদানে রেখেছেন প্রশংসিত স্থান (মাকামে মাহমুদ)।

৪. রাতে জেগে ইবাদত করা আর ঘুমিয়ে থাকা কি এক? আল্লাহ প্রশ্ন করেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা সিজদায় ও দাঁড়িয়ে ইবাদত করে, আখেরাতকে ভয় করে এবং তার প্রতিপালকের রহমতের আশা রাখে, সে কি তার সমান যে এরূপ করে না?’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৯)

উঠুন। দুই রাকাত-চার রাকাত নামাজ পড়ুন। সিজদায় মাথা রাখুন। বলুন, ‘হে আল্লাহ! আমি এসেছি।’ দেখবেন, ফোনের স্ক্রিন যে শূন্যতা দিত, সিজদার সুকুন সেটা ভরিয়ে দেবে।

যারা ‘কানিত’ বা রাতের প্রহরে বিনীতভাবে ইবাদতকারী, ‘সাজিদ’ ও ‘কায়িম’ বা সিজদায় এবং দাঁড়িয়ে দুই অবস্থায়ই যারা আল্লাহর আনুগত্য করে, আল্লাহ নিজেই প্রশ্ন করছেন, তারা কি ইবাদত না–করা লোকদের সমান? এর উত্তর আমি আপনি আমরা সবাই জানি।

এবার গভীরভাবে ভাবুন

রাত তিনটায় যখন ফোনের স্ক্রিনে চোখ আপনার, অস্থির লাগছে, ভাবুন, আল্লাহ ডাকছেন। সত্যিই ডাকছেন। এটা কোনো অলীক কথা নয়, বরং এটা হাদিসে বর্ণিত সত্য।

কোরআনেও তিনি বহুবার বলেছেন, এই সময়ে জাগতে, তাকে ডাকতে, তিনি কাছেই আছেন, প্রথম আসমানে, অথবা তিনি আমাদের গ্রীবা বা ধমনিরও কাছে। নামাজে দাঁড়ালে তাঁর আরও নৈকট্য পাব। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটে থাকে সিজদার সময়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)

উঠুন। দুই রাকাত-চার রাকাত নামাজ পড়ুন। সিজদায় মাথা রাখুন। বলুন, ‘হে আল্লাহ! আমি এসেছি।’ দেখবেন, ফোনের স্ক্রিন যে শূন্যতা দিত, সিজদার ‘সুকুন’ সেটা ভরিয়ে দেবে।

  • মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর : খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *