Skip to content
Home » Blog » ওলে ওলে মেসি: বান্দেরাসো—আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ঐতিহ্যবাহী প্যারেড

ওলে ওলে মেসি: বান্দেরাসো—আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ঐতিহ্যবাহী প্যারেড

৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা, তীব্র ট্রাফিক জ্যাম আর পার্কিংয়ের ঝক্কি পেরিয়ে যখন টেক্সাসের ডালাস শহরের কেন্দ্রস্থল ক্লাইড ওয়ারেন পার্কে পৌঁছালাম, তখন র‍্যালি পুরোদমে জমে উঠেছে। পুরো পার্ক আর সংলগ্ন রাস্তা যেন আকাশি-নীলের সমুদ্রে পরিণত হয়েছে—পতাকা, নানান বাদ্যযন্ত্র আর মানুষের ঢল। মিছিলের ছন্দময় স্লোগানের তালে তালে হাজারো সমর্থকের সম্মিলিত লাফালাফিতে আক্ষরিক অর্থেই পার্কের মাটি কেঁপে উঠছে। ‘মেসি’ আর ‘আর্জেন্টিনা’ ছাড়া আর কোনো শব্দই বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু আবেগের তীব্রতা ভাষার সীমা অনায়াসেই অতিক্রম করে আমাকে ছুঁয়ে গেল।

স্লোগানের অর্থ বোঝার জন্য এক মাঝবয়সী সমর্থককে পাকড়াও করলাম। কিন্তু চারদিকে এমন শব্দের তীব্রতা যে পাশাপাশি দাঁড়িয়েও একজন আরেকজনের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। অনেক কষ্টে যা বুঝলাম, সমর্থকেরা যা উচ্চারণ করছেন, সেগুলো স্প্যানিশ ভাষার ছন্দোবদ্ধ স্লোগান—গান নয়। কথাগুলো এমন—

‘পোর লা উল্তিমা দে লেও! আরহেন্তিনা, কিয়েরো ভের্তে বিকাম্পেওন!’

(লিওর শেষবারের জন্য—আর্জেন্টিনা, তোমাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হতে দেখতে চাই।)

যথার্থ চাওয়া—অস্বীকার করার উপায় নেই!

সমর্থকদের এমন আবেগ আমি আগে কখনো দেখিনি। প্রচণ্ড গরমে সবাই ঘামে অস্থির, কিন্তু প্রিয় দলকে উৎসাহ দিতে সেই অস্বস্তি যেন তাঁদের কাছে তুচ্ছ। এটাই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ‘বান্দেরাসো’-র মূল মন্ত্র। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগের দিন উদ্দীপনামূলক স্লোগান আর পতাকা হাতে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের এই ঐতিহ্যবাহী পদযাত্রাকেই বলা হয় ‘বান্দেরাসো’। ২০২৬ বিশ্বকাপে টেক্সাসের ডালাসে আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ, তার ওপর লিওনেল মেসির দুর্দান্ত ফর্ম—সব মিলিয়ে ডালাসের বান্দেরাসো যে জাঁকজমকপূর্ণ হবে, সেটাই স্বাভাবিক।

‘বান্দেরাসো’ শব্দটি স্প্যানিশ; মার্কিন উচ্চারণে অনেকেই বলেন ‘ব্যান্ডেরাজো’ (Banderazo)। শব্দটির উৎপত্তি স্প্যানিশ Bandera থেকে, যার অর্থ ‘পতাকা’। সে অর্থে বান্দেরাসোকে পতাকাবাহী মিছিল বললে খুব একটা ভুল হবে না। বিশাল বিশাল পতাকা তো ছিলই; বেশির ভাগ পতাকাজুড়ে ছিল ১০ নম্বর জার্সি, মেসি, আর অবশ্যই ম্যারাডোনার অবিসংবাদিত উপস্থিতি।

বিশ্বকাপের উত্তেজনার পারদ এখন এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে যে সাধারণত নিস্তরঙ্গ বড় বড় মার্কিন শহরগুলোও উৎসবের আবহে রঙিন হয়ে উঠেছে। ক্লাইড ওয়ারেন পার্কই ডালাসের অফিশিয়াল বান্দেরাসোর নির্ধারিত স্থান। পার্ক এবং সংলগ্ন রাস্তাজুড়ে ছিল কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। মিছিলটি চলমান নয়; বরং স্থির—চারপাশে যেন এক উৎসবমুখর মেলার পরিবেশ। খাবারের জন্য সারি সারি ফুড ট্রাক, বিনা মূল্যে ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা, আবার ঘাসের ওপর বিছিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সি, পতাকা আর বিশ্বকাপের নানা স্মারক বিক্রিরও রমরমা আয়োজন। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।

লাতিন আমেরিকার ফুটবল-উন্মাদনার গল্প এত দিন শুধু বই-পুস্তকেই পড়েছিলাম। আজ তা নিজের চোখে দেখলাম, নিজের ভেতর অনুভব করলাম, আপ্লুত হলাম। বুঝলাম, এই আবেগকে অক্ষরের জালে বন্দী করার চেষ্টা আসলে অনেকটাই বৃথা।

*লেখক: ইশতিয়াক রহমান, সেমিকন্ডাক্টর প্রসেস ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *